প্রকাশিত হলো তৃণমূলের তালিকা: চূড়ান্ত চিত্র, নেপথ্যের কারণ এবং মমতা-অভিষেকের ছবি

 তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা: শেষমেশ কী হল কেনই বা হল, মমতা-অভিষেক তালমিলের ছবিটা নজরে পড়ল কি

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের (West Bengal Election 2026) দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার পর মঙ্গলবার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা (TMC Candidate list 2026)  ঘোষণা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকার ছবিটা কী হতে পারে সে ব্যাপারে আগেই অনেকটা লেখা হয়েছিল দ্য ওয়ালে। এদিন তা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গেল। কৌতূহলের বিষয় হল, সামগ্রিকভাবে এই তালিকা কী বার্তা দিচ্ছে? প্রার্থী তালিকার চূড়ান্ত ছবিটা কেমন হল, আর কেনই বা তা হল?

দিদি-অভিষেকের বোঝাপড়া

গোড়াতেই যা নজরে পড়েছে তা হল, গত দশ বছরে সম্ভবত এই প্রথম বার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা তৈরি করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে তেমন কোনও মতান্তর দেখা গেল না। ছোট্ট করে চব্বিশের প্রার্থী তালিকা তৈরির পর্বের কথা এখানে মনে করানো যেতে পারে। দিদি প্রার্থী করলেও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌগত রায়ের জন্য প্রচারেই যাননি অভিষেক। 
কিন্তু এবার যে ছবি দেখা গেল, তা হল তালমিল ও বোঝাপড়ার। অভিষেকের হাতে অনেকটাই ব্যাটন তুলে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিয়েছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও। এদিন প্রার্থী তালিকার প্রথম পৃষ্ঠাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পড়ে বাকিটা যেভাবে অভিষেককে পড়তে বলেছেন দিদি, সেই ফ্রেমেই এই তালমিল, বোঝাপড়া ও ব্যাটন তুলে দেওয়ার প্রতীকী ছবিটা রয়েছে।

কারা টিকিট পেলেন না, কেন পেলেন না

তৃণমূলের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটা এবার খুব সহজ এক্সারসাইজ ছিল না। একটানা ১৫ বছর ক্ষমতায় রয়েছে দল। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। তার পর বহু বিধায়কের বিরুদ্ধে স্থানীয় স্তরে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাও ছিল। তাই এবার যে বহু আসনে বর্তমান বিধায়করা টিকিট পাবেন না, গত অক্টোবরেই তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অভিষেক। কারণ, তাঁর ও আইপ্যাকের মনে হয়েছিল, এমন কিছু আসন রয়েছে যেখানে সিটিং এমএলএ-কে আর প্রার্থী না করলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মোকাবিলা করা যেতে পারে।

হয়েছেও তাই। ৭৪ জন বর্তমান বিধায়ককে আর টিকিট দেওয়া হয়নি। হাওড়া শিবপুরে মনোজ তিওয়ারি, জোড়াসাঁকো আসনে বিবেক গুপ্ত, পাণ্ডুয়ায় রত্না দে নাগ, সাবিত্রী মিত্র, উত্তরপাড়ায় কাঞ্চন মল্লিক, বলাগড়ে মনোরঞ্জন ব্যাপারী এঁদের মধ্যে অন্যতম। বস্তুত হুগলি জেলায় যে অন্তত ৫০ শতাংশ নতুন মুখ দেওয়া হবে তা আগেই লিখেছিল দ্য ওয়াল। এদিন দেখা গেল, হুগলিতে যেন সাইক্লোন হয়েছে। জেলার ১৮টি আসনের মধ্যে ১০টি আসনে তথা—শ্রীরামপুর, চুঁচুড়া, সপ্তগ্রাম, উত্তরপাড়া, বলাগড়, পাণ্ডুয়া, পুরশুরা, খানাকুল, গোঘাট, আরামবাগে প্রার্থী বদল করা হয়েছে।

আবার ১৫ জন বর্তমান বিধায়কের আসন পরিবর্তন করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক কারণে কয়েক জনের আসন বদল হয়েছে। যেমন রত্না চট্টোপাধ্যায়কে বেহালা পূর্ব থেকে আনা হয়েছে বেহালা পশ্চিমে। বিদেশ বসুকে উলুবেড়িয়া পূর্ব থেকে আনা হয়েছে হুগলির সপ্তগ্রামে। 
কিছু বিধায়ককে তাঁর এলাকায় প্রার্থী করলে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, কিন্তু দল তাঁদের প্রার্থী করতে চাইছিল। সেই কারণেও অনেকের আসন বদলেছে। যেমন সোহম চক্রবর্তী, প্রাক্তন পুলিশ কর্তা হুমায়ুন কবীর, প্রমুখ।

ঘটনা হল, আসন বদলাতে চেয়েছিলেন আরও বেশ কয়েকজন বিধায়ক। কিন্তু কালীঘাট ও ক্যামাক স্ট্রিট সবার সেই বায়নাক্কা শুনতে চায়নি। যেমন, রেশন দুর্নীতি কাণ্ডে অভিযুক্ত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বর্তমানে হাবড়ার বিধায়ক। তিনি অন্য আসনে টিকিট চাইছিলেন। দল তা শোনেনি। তাঁকে হাবড়াতেই প্রার্থী করা হয়েছে।

টলিপাড়ার নতুন মুখ নেই কেন ?

বাংলায় গত তিনটি বিধানসভায় টলিপাড়া থেকে ভূরি ভূরি মুখ এসেছে তৃণমূলে। তাঁদের প্রার্থী করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু অভিষেকের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। এ ধরনের অ্যামেচার অরাজনৈতিক চরিত্রদের এনে দলের কোনও উপকার হয় না। তাঁদের উপকার হয় ঠিকই। অভিষেক এই শর্তে অবিচল ছিলেন। তাই প্রার্থী তালিকায় টলিপাড়ার নতুন কোনও মুখই শেষমেশ দেখা গেল না। এতে অভিষেকের সিগনেচার স্পষ্ট।

অভিষেকের স্পষ্ট সাক্ষর রয়েছে নন্দীগ্রামে প্রার্থী বাছাইয়েও। স্থানীয় বিজেপি নেতা পবিত্র করকে এদিন তৃণমূলে ফিরিয়ে আনেন অভিষেক। তার পর নন্দীগ্রাম থেকে পবিত্রর নাম ঘোষণা করা হয়। দিদি যে অভিষেককে নন্দীগ্রামে প্রার্থী বাছাইয়ে স্বাধীনতা দিয়েছেন, সেই ছবিটাও এর মধ্যেই রয়েছে।    

নতুন মুখ

এবারের প্রার্থী তালিকায় নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে বেশ কিছু নতুন মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে। যেমন লোকসভা ভোটে দেবাংশু ভট্টাচার্য তমলুকে হেরে যাওয়ার পরই বোঝা গেছিল, দল তাঁকে ফের বিধানসভায় প্রার্থী করবে। হয়েছেও তাই। দেবাংশুকে প্রার্থী করা হয়েছে চুঁচুড়ায়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে এবার রাজ্যসভায় আর মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। ঋতব্রতও চাইছিলেন বিধানসভায় লড়তে। তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে উলুবেড়িয়া পূর্ব আসনে। কুণাল ঘোষকে রাজ্যসভায় মনোনয়ন না দিলেও বেলেঘাটায় যে প্রার্থী করা হতে পারে তা দিব্য বোঝা যাচ্ছিল। সেটাই হয়েছে। নোয়াপাড়ায় মঞ্জু বসুকে আর প্রার্থী না করে সেখানে টিকিট দেওয়া হয়েছে তরুণ নেতা তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে। একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইলেকশন এজেন্ট ও রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীকে বেহালা পূর্বে প্রার্থী করা হয়েছে। আর তালড্যাংরার প্রাক্তন বিধায়ক তথা তৃণমূলের তুখোড় বক্তা বলে পরিচিত সমীর চক্রবর্তীকে এবার প্রার্থী করা হয়েছে পাণ্ডুয়া। 
প্রার্থী তালিকায় নতুন মুখেদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের একজন প্রার্থীও রয়েছেন। তিনি প্রাক্তন সাংবাদিক দেবদীপ পুরোহিত, বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী মিডিয়া উপদেষ্টা। খড়দহে প্রার্থী করা হয়েছে তাঁকে। 

এদিন পবিত্র কর ছাড়াও তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের সবাইকেই প্রার্থী করা হয়েছে।

ঘর ওয়াপসি

একুশের বিধানসভা ভোটের পরই বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফিরে এসেছিলেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও সব্যসাচী দত্ত। অভিষেক বলেছিলেন, এঁদের চার বছর প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। দেখা গেল, ‘প্রায়শ্চিত্ত’ শেষে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করা হয়েছে ডেবরায়। সব্যসাচীকে দলে ফেরানোর উদ্যোগ অবশ্য ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। 

সব শেষে পড় রইলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। তৃণমূলের ২০২৬-এর প্রার্থী তালিকায় শোভনের নাম নেই। অনেকের মতে, এটা ভবিষ্যতে একটা বড় পরিবর্তনের লক্ষণ। তা হল, ডিসেম্বরে কলকাতায় পুর ভোটের সময়ে শোভন চট্টোপাধ্যায়কে কলাকাতার মেয়র প্রোজেক্ট করা হবে।

এদিন প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বভাবসুলভ প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ২০২৬ সালে ২২৬টি আসনে জিতবে তৃণমূল। তাঁর সেই দাবি মিলিয়ে দেখার জন্য অবশ্য অপেক্ষা করে থাকতে ৪ মে পর্যন্ত।

Post a Comment

0 Comments